২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২ - ১০ মার্চ, ২০২৬ - 10 March, 2026

রাজারহাটে তিস্তা ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে মানহীন ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিল

3 hours ago
21


প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম):  

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে তিস্তা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে বাস্তবায়নাধীন সরকারি প্রকল্পে নিম্নমানের জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ব্যবহারের অভিযোগে ৬ হাজার বালুভর্তি ব্যাগ বাতিল করেছে সংশ্লিষ্ট কারিগরি টাস্কফোর্স। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন, সরকারি অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে জেলায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ঝড় উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের খিতাব খাঁ এলাকায় তিস্তা নদীর তীর রক্ষায় প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী ব্যবহৃত জিও টেক্সটাইল ব্যাগের পুরুত্ব ন্যূনতম ৩ মিলিমিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। তবে সরবরাহকৃত একাংশ ব্যাগে নির্ধারিত এই মান বজায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ উঠে। জানা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পটির কার্যাদেশ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া হলেও স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ছিল একটি ‘ছায়া ঠিকাদারি’ ব্যবস্থার হাতে। অভিযোগ রয়েছে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান প্রকল্পটির বাস্তব তদারকিতে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তার প্রভাবেই কাজটি পরিচালিত হচ্ছিল। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩০ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে নিক্ষেপের কাজ চলছিল। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী জিও ব্যাগ নদীতে ফেলার আগে মান পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে-পরীক্ষার আগেই কিছু ব্যাগ নদীতে ডাম্পিং শুরু করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের টাস্কফোর্স, প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম-এর নেতৃত্বে ২০২৫ সালের জুন মাসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্যাগের নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ৬ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। ফলে সেগুলো সরাসরি বাতিল ঘোষণা করা হয়। টাস্কফোর্সের সরেজমিন পরিদর্শনেও ব্যাগের পুরুত্বে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“সরকারি প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ সরবরাহ করা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কার্যাদেশ বাতিল, জরিমানা কিংবা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ব্ল্যাকলিস্ট করার বিধান রয়েছে।” এদিকে ব্যাগ বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে গত ৫ মার্চ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান দলীয় কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুড়িগ্রাম কার্যালয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ওসমান ফারুক, গোলাম রব্বানী ও আবুল কালাম আজাদসহ অনেকেই বলেন, একই জিওব্যাগ বার বার ব্যবহার করে হিসাব দেখানো হয়।এছাড়া নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে নদীভাঙন প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। এতে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি নদীতীরবর্তী  আমাদের মতো মানুষের জীবন ও সম্পদ আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান-এর কাছে ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিলের কারণ জানতে চান। উপস্থিত কয়েকজনের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা-এর বক্তব্য জানতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি বার্তাটি দেখেছেন, তবে এ বিষয়ে কোনো জবাব দেননি।

অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুর রহমান রানা বলেন, “দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত ঘটনা জানতে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”

 এ বিষয়ে সোমবার(৯মার্চ) পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুড়িগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “টাস্কফোর্স সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী কাজের মান পরীক্ষা করেছে। নির্ধারিত ৩ মিলিমিটার পুরুত্ব না থাকায় ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব গ্রহণ করা হয়নি।”

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

// Set maxWidth