৬ বৈশাখ, ১৪৩৩ - ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ - 19 April, 2026

প্লাস্টিক সামগ্রির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির খেলনা, সংকটে লালমনিরহাটের মৃৎশিল্পীরা !

5 hours ago
40


আসাদুজ্জামান সাজু, লালমনিরহাট:

আমরা মাটির খেলনা বানিয়ে ছোট থেকে বড় হয়েছি। একসময় গ্রামের হাট-বাজারে মাটির পুতুল, বাচ্চাদের হাঁড়িপাতিল, গরু, ঘোড়া, হাতি এসব খেলনার কদর ছিল তুলনামূলক অনেক বেশী। কিন্তু বর্তমানে সময়ে প্লাস্টিক সামগ্রীর ভিড়ে সব বদলে গেছে। বাজার ভরে গেছে রঙিন প্লাস্টিকের খেলনায়। যেগুলো দেখতে চকচকে, টেকসই আর সহজে পাওয়া যায়। তাই বাচ্চারাও এখন মাটির খেলনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা পাল পাড়ার কোনা পাল।

বাংলার শৈল্পিক ঐতিহ্য বহনকারী ওই মৃৎশিল্পীদের প্রায় ২০-২৫ টি পরিবার বসবাস করে কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের কুমার পাড়ায়।

কুমার পাড়ার ফনিমল পাল বলেন, ‘আমরা মৃৎশিল্পের সাথে বহুকাল থেকে জড়িত। এখন এসব বানিয়ে আমাদের জীবন চলছে না। মাটি কিনতে হয়। আগেও কিনতে হয়েছে কিন্তু এখন দাম বেশি। এতো দামে মাটি কিনেও বিক্রি ঠিকমতো না হওয়ায় সংসার ভাল চলছে না। আমাদের পোষাচ্ছে না। আগে আমাদের ভাল আয় হতো। বর্তমানে আয় অনেক কম। মানুষ এখন আর আমাদের জিনিসপত্র কেনে না। এখন সিলভার, স্টিল, প্লাস্টিক বের হয়েছে। তাই আমাদের মাটির জিনিস আর চলে না। তাই সংসারের বেহাল অবস্থা। অন্যান্য জায়গায় কাজ করি ওই কাজ দিয়েই আমাদের সংসার চলে।’

জেলার বিভিন্ন উপজেলার কুমারপাড়াগুলোতে এই সংকট এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। স্থানীয় কুমারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে সারা বছরই মাটির খেলনার চাহিদা থাকলেও বর্তমানে তা অনেকাংশে কমে গেছে। বাজার দখল করে নিয়েছে রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা- যা দেখতে আকর্ষণীয়, টেকসই এবং তুলনামূলক দাম কম হওয়ার কারণে ক্রেতাদের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। ফলে ধীরে ধীরে অবহেলিত হয়ে পড়ছে পরিবেশবান্ধব মাটির তৈরি খেলনা।

শিল্পীরা জানান, শুধু চাহিদা কমে যাওয়াই নয়, উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। মাটি সংগ্রহ, জ্বালানি, রং ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের মতো লাভ করা তেমন সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কারিগর নিরুপায় হয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের এই পেশা বদল করে ভিন্ন পেশার দিকে ঝুঁকছেন। জীবিকার তাগিদে এখন কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, আবার কেউ বিভিন্ন খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের কুমোর পাড়ার প্রবীণ কারিগর হরি চন্দ্র রায় বলেন, এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করার কথা ভাবছি। কারণ এই কাজে এখন আর পরিবার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আগে এ কাজের জন্য পাইকাররা অগ্রিম টাকা দিত, এখন হাতে গোনা কিছু পাইকার আসে, তাও বাকিতে মাল নিয়ে যায়। পরে টাকা দেওয়ার কোনো খবর নাই।

তিনি আরও বলেন, এই কাজ আমাদের বাপ-দাদার পেশা। কিন্তু এখন আর এতে সংসার চলে না। নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আসতে চায় না। তরুণদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারই এখনও এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ না নিলে এই শিল্প একসময় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তারা সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কুমোরদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দেশীয় পণ্যের প্রচার বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

অন্যদিকে পরিবেশবিদদের মতে, প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশ রক্ষায় মাটির পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সে ক্ষেত্রে মাটির খেলনা শিল্পকে টিকিয়ে রাখা শুধু একটি ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়, বরং পরিবেশ সুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

লালমনিরহাটের কুমোরদের এই সংগ্রাম শুধুই জীবিকার লড়াই নয়- এটি একটি হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা। এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং কার্যকর পরিকল্পনা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও গ্রামীণ বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

// Set maxWidth