৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ - ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ - 18 September, 2026

প্লাস্টিকের দাপটে হারাচ্ছে মৃৎশিল্প, টিকে থাকার লড়াই সুন্দরগঞ্জের কুমারদের

148
2026-08-03 19:49:43

news-picture

হযরত বেল্লাল, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা):

হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ আধুনিকতার চাপে অস্তিত্ব সংকটে। প্লাস্টিক ও অন্যান্য আধুনিক উপকরণের দাপটে কমে গেছে মাটির তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার। তারপরও বাপ-দাদার পেশা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদেরই একজন চণ্ডীপুর ইউনিয়নের কুমারপাড়া গ্রামের রত্না রানী। রত্না রানীর বাবার বাড়ির কেউই মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়। স্বামী জয়ন্ত সরকার, শাশুড়ি, ননদ, জা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা সবাই মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনিও এই পেশায় হাতেখড়ি নেন। বিয়ের মাত্র সাত দিন পর থেকেই পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির কাজ শুরু করেন। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই তিনি দক্ষ মৃৎশিল্পীতে পরিণত হন।

রত্না রানী বলেন, মাটির তৈরি জিনিসে নকশা করতে কোনো মেশিন লাগে না। সম্পূর্ণ হাতের কারুকাজে প্রতিটি পণ্য তৈরি করতে হয়। এই শিল্পই এখন আমাদের সংসারের প্রধান অবলম্বন। আমরা চাই, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প বেঁচে থাকুক।

মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন শিল্প মৃৎশিল্প একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বর্তমানে প্লাস্টিক ও স্টিলের পণ্যের ব্যাপক ব্যবহারে এর চাহিদা অনেকটাই কমে গেলেও এখনো বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও দৈনন্দিন ব্যবহারে মাটির তৈরি কিছু সামগ্রীর গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে বাটনা, সরা, হাড়ি, পাতিল, কলস, গাছের টব, খেলনা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার বিভিন্ন সামগ্রী এখনো মাটির তৈরি ছাড়া কল্পনা করা যায় না।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো প্রায় পাঁচ শতাধিক কুমার পরিবার রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে আর্থিক সংকট ও বাজারের চাহিদা কমে যাওয়ায় পেশা পরিবর্তন করেছেন। তবে অনেক পরিবার এখনো বংশপরম্পরায় এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন।

মৃৎশিল্পী জয়ন্ত সরকার জানান, আগে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফেরি করে মাটির তৈরি সামগ্রী বিক্রি করা হতো। এখন বিভিন্ন হাট-বাজার ও কারুশিল্পের দোকানে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি হয়। তবে কাঁচামালের দাম বাড়ায় লাভের পরিমাণ অনেক কমে গেছে।

তিনি বলেন, এঁটেল মাটি, পরিবহন খরচ, কাঠকয়লা, কাঠের গুড়া, রংসহ সব উপকরণের দাম বেড়েছে। একটি সরা তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় দুই টাকা। সেটি পাইকারি বিক্রি হয় পাঁচ থেকে ছয় টাকায়, আর খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ১৫ থেকে ২০ টাকায়।

সুন্দরগঞ্জ বাজারের কারুশিল্প ব্যবসায়ী রনজিৎ চন্দ্র বর্মন বলেন, মাটির তৈরি কিছু পণ্যের কদর এখনো রয়েছে। বিশেষ করে গাছের টব, বাটনা, দই রাখার সরা ও দানাগুড় সংরক্ষণের কলসের চাহিদা ভালো। মাটির কলসে রাখা পানি দীর্ঘ সময় ঠান্ডা থাকে এবং খাদ্য সংরক্ষণেও এটি উপকারী।

ধুবনী ইউনিয়নের কঞ্চিবাড়ি কুমারপাড়া গ্রামের প্রায় ৫০ বছর ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত সাধন চন্দ্র বলেন, এটি আমাদের বাপ-দাদার পেশা। তাই ছাড়তে পারিনি। তবে আমার সন্তানরা অন্য পেশায় চলে গেছে। আগে নদী থেকে বিনা খরচে মাটি সংগ্রহ করা যেত, আর গাছের পাতা বা বাঁশের পাতা দিয়ে পণ্য পোড়ানো হতো। এখন মাটি কিনতে হয়, কাঠের গুড়াও কিনতে হয়। পুঁজি না থাকায় এই পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

দহবন্দ গ্রামের ৮০ বছর বয়সী মো. আকবর আলী বলেন, একসময় মাটির তৈরি প্লেট, গ্লাস, কলস, হাড়ি, পাতিল, বাটি, বাটনা ও সরার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। এখন সবই প্লাস্টিকের দখলে চলে গেছে। তবে মাটির বাটনায় মরিচ, পেঁয়াজ, আদা বা রসুন বাটার স্বাদ এখনো আলাদা।

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আগে নদীর ঘাট থেকে এঁটেল মাটি সংগ্রহ করে কুমাররা পণ্য তৈরি করতেন। এখন সেই সুযোগ নেই, মাটি কিনেই কাজ করতে হচ্ছে। মৃৎশিল্প বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ। সরকার যদি সুদমুক্ত ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে, তাহলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের মতে, মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, আধুনিক পণ্যের প্রতিযোগিতা এবং পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার অভাবে এই শিল্প আজ সংকটে। তাই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প সংরক্ষণে সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়