১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ - ০১ নভেম্বর, ২০২৬ - 01 November, 2026

৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, জিপিএ ৪.২১ পেয়ে নজর কাড়লেন নীলফামারীর শেফালী

49
2026-10-31 19:33:50

news-picture

হাবিবুল হাসান হাবিব,ডিমলা (নীলফামারী):

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছ। আর সেই পরীক্ষায় জীবনের অর্ধশতক পেরিয়ে নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরু করে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ অর্জন করেছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকার শেফালী বেগম।

দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, সংসারের দায়িত্ব ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাঁর এই সাফল্য পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি করেছে। গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অনিয়মিত শিক্ষার্থী শেফালী ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ৫২ বছর বয়সে তাঁর এই অর্জন শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহ ও ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল মেধা ও সম্ভাবনায় ভরা। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক নানা সংকটে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে মেধাতালিকায় থাকা এই শিক্ষার্থীকে একসময় বই-খাতা ছেড়ে সংসারের বাস্তবতায় প্রবেশ করতে হয়। পরবর্তী সময়ে স্বামী-সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকে তাঁর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্ন কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। স্বামী ও তিন সন্তানের উৎসাহে জীবনের এই পর্যায়ে এসে আবারও পড়াশোনা শুরু করেন শেফালী। বয়সের ব্যবধান, দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি কিংবা সংসারের ব্যস্ততা কোনোটিই তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

শেফালীর ছেলে আব্দুর রাজ শাফি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। মায়ের সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মায়ের এই সাফল্য আমাদের পরিবারের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাঁর ত্যাগ, দোয়া ও অনুপ্রেরণার কারণেই আমরা আজ প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। আমি চাই, মা এখানেই থেমে না থেকে স্নাতকসহ আরও উচ্চশিক্ষা অর্জন করুন।

মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, “মায়ের এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি সমাজের সব নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না।

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক দিলীপ রায় বলেন, “দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। শেফালী বেগম প্রমাণ করেছেন,শিক্ষা বয়সের কাছে নয়, ইচ্ছাশক্তির কাছেই হার মানে। তাঁর সাফল্য অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।

শেফালী বেগমের নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজ বলেন, “আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন,এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

শেফালীর এই অর্জন বিশেষ করে তাঁদের জন্য অনুপ্রেরণা, যাঁরা বয়স, সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক নানা কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছেন। তাঁর সাফল্য মনে করিয়ে দেয়, স্বপ্ন পূরণের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়