৫ মাঘ, ১৪৩২ - ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ - 19 January, 2026

যাত্রী নামাতে থামে শহর

6 hours ago
16


নিজস্ব প্রতিবেদক:

রংপুর নগরীর লালবাগ এলাকায় থমকে আছে সব ধরনের যানবাহন। কোলাহলের ভেতর কয়েক কদম এগোলেই খামারমোড়ে দৃশ্য বদলে যায়। রেললাইন পেরোনোর পর রাস্তা প্রায় ফাঁকা। অথচ লালবাগ মোড়ে যানজটের কারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়, যাত্রী ওঠানামার জন্য মাঝরাস্তায় থেমে থাকা যানবাহনই এই সংকীর্ণ সড়কটিকে প্রতিদিন জ্যামের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার বিস্তার ঘটেছে মূলত পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ আর কর্মসংস্থানের চাপ থেকে। গত কয়েক বছরে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আগমন বেড়েছে। স্বল্প পুঁজি, কম প্রশিক্ষণ আর দ্রুত আয়ের সুযোগ থাকায় অনেকেই অটোরিকশা চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

একই সঙ্গে গণপরিবহনের ঘাটতি, বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে চলাচলের জন্য কার্যকর কোনো বিকল্প না থাকায় এই যান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে অটোরিকশা ছিল সীমিত এলাকায়। কিন্তু ধীরে ধীরে কোনো অনুমোদন বা নির্দিষ্ট রুট ছাড়াই এটি শহরের প্রধান সড়কগুলো দখল করে নেয়।

নির্দিষ্ট কোনো জাতীয় নীতিমালা না থাকা, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বে অবহেলা,

লাইসেন্স বা ফিটনেস বাধ্যতামূলক না থাকার

ফলে চালক প্রশিক্ষণহীন, যানবাহন নিবন্ধনহীন এবং চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন। রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের কারণেও অনেক সময় কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না। এতে নিয়ম ভাঙাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। 

অটোরিকশার কোনো নির্দিষ্ট স্টপেজ নেই। ফলে চালকেরা যেখানেই যাত্রী পান, সেখানেই মাঝরাস্তায় থামেন। বিশেষ করে সংকীর্ণ সড়কে একটি অটোরিকশা থামলেই পেছনের পুরো লেন বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের এই থামা ধীরে ধীরে দীর্ঘ যানজটে রূপ নেয়।

পায়ে হেটে চলা এক যাত্রী বলেন, গত ২/৩ বছর আগেও আমি যেখানে টাইমলি যেতে পারতাম কিন্তু এখন তা পারছি না। আমি মনে করি এটা সড়কের বিশৃঙ্খলা স্বরুপ। প্রশাসনের স্বদইচ্ছা ব্যাতিত এখানে কোনো সমাধান নেই।

ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালক সোহেল রানা বলেন,  “আমরা ইচ্ছা করে রাস্তায় জ্যাম করি না। যাত্রী যেখানে নামতে চায়, সেখানেই নামাতে হয়। স্টপেজ নাই, আলাদা লেন নাই। দিনে আয় না করলে পরিবার চলবে কীভাবে? নিয়ম থাকলে আমরা মানতেও প্রস্তুত।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, “ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার সংখ্যা এত বেশি যে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ চালকেরই লাইসেন্স নেই, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণাও কম। আমরা চাপ দিলে কিছুক্ষণ শৃঙ্খলা আসে, কিন্তু নিয়মিত নজরদারি ও নীতিমালা ছাড়া এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান সম্ভব নয়।”

ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার বিশৃঙ্খলা শুধু চালক বা যাত্রী নয়, শহরের অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতারও পরিচায়ক। লালবাগ মোড়ের সংকীর্ণ সড়ক, পর্যাপ্ত লেন না থাকা, নির্দিষ্ট স্টপেজ ও রুটের অভাব। সবই দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির ফল।

শহরের নগর পরিকল্পনা কেবল রাস্তা বা সিগন্যাল স্থাপন নয়। এটি হলো যান চলাচলের প্রাকৃতিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, গণপরিবহনের বিকল্প তৈরি করা, এবং ব্যবসা, বাসিন্দাদের প্রয়োজন মেলানো। অথচ রংপুরের মতো মধ্যম মানের শহরে এসব পরিকল্পনা বহু বছর ধরে আংশিক ও অপর্যাপ্ত।

ফলে যাত্রী সুবিধা ও আয় নিশ্চিত করার জন্য ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার বিস্তার ঘটে, কিন্তু শহরের সড়ক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়।

যেখানে সড়ক পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে অটোরিকশার বিস্তার জ্যামের মাত্রা বাড়াচ্ছে। আজকের অস্থিরতা আগামী দিনে শহরের চলাচল ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করবে।

তবে এই ধরনের যান পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়। কিন্তু সঠিক নীতিমালা, নির্দিষ্ট রুট, নিবন্ধন ও চালক প্রশিক্ষণ ছাড়া এই বিষফোড়া আরও ছড়াবে একসময় পুরো সড়ক ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে তুলবে। শহর বাঁচাতে হলে, এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নাইলে রাস্তায় মানুষ চলবে না, চলবে শুধু বিশৃঙ্খলা।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

// Set maxWidth