তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শূন্যতায়, হতাশ নদী পাড়ের মানুষ
কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলাসহ উত্তরের জনপদের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর তিস্তা নদী। কৃষক, জেলে ও তীরবর্তী গ্রামের মানুষেরা এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় উজানের আগ্রাসনে ভাঙরে শিকার হয়ে প্রতি বছর বসতভিটা ও ফসলী জমি হারিয়ে হাজারো পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায়নি। গত বছর পানি সম্পদ উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন করা হবে। তবে ঘোষণার ১৮ দিন পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ শুরুর আলামত দেখা যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদী কেন্দ্রিক পানিসংকট, নদীভাঙন ও কৃষি বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে এ মহাপরিকল্পনা ছিল বাঁচার শেষ আশার প্রতীক। চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকা মানুষের আশা এখন রূপ নিয়েছে হতাশায়।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের সংগঠনগুলোর নেতাদের অভিযোগ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ভূ-রাজনীতির মারপ্যাচে পড়ে উত্তরের জনপদের মানুষেরা প্রতারণার শিকার হচ্ছে। তারা বলছেন, বারবার রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
তিস্তা নদী আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে মানুষকে শুধু আশার বাণী শোনানো হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জানুয়ারিতেই কাজ শুরুর কথা ছিল। পানি সম্পদ মন্ত্রী নিজেই ১ জানুয়ারির উদ্বোধনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৬ দিন পেরিয়ে গেলেও মাঠে কোনো কাজ নেই। এটি স্পষ্টভাবে ভূ-রাজনীতির মারপ্যাচে তিস্তা অববাহিকার মানুষের সঙ্গে মুলা ঝোলানো এবং প্রতারণা করা হচ্ছে।
তিস্তা নদী তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দা জসিম সরকার বলেন, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা। বারবার প্রপ্রশ্রুতি দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করায় মানুষের ধৈরে্যর বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তিস্তা রক্ষা আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা জানান, শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পরিমান পানি না থাকায় কৃষকদের সেচ দিয়ে ফসল ফলাতে হচ্ছে। আর বর্ষায় নদী ভাঙনে মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তিস্তার দু‘পুাড়ে কর্মসংস্থানের মহাযজ্ঞ সৃষ্টি হবে এবং লাখো মানুষের বেকারত্ব লাঘব হবে। অন্যদিকে বসতভিটা ও ফসলি জমি নদী ভাঙণ থেকে রক্ষা পাবে লাখো পরিবার।
নদীর তীরবর্তী সাহাবাজ গ্রামের কৃষক আহম্মদ আলী, সোবহান মিয়াসহ একাধিক কৃষক জানান, শুস্ক মওসুমে নদীতে পানি নাই। সেচের পানির সংকটে আবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে বর্ষায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটে নদীপাড়ের মানুষের।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু জানান, অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষনা দিয়েছিলো, চলতি মাসে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করবে। কিন্তু সরকার তা করলো না। রংপুরাঞ্চলের মানুষ বিগত সরকারের সময়ও অবহেলিত ছিল, এই সরকারের সময়ও তাই হলো। তিনি বলেন, নির্বাচন শুরু হয়ে গেছে। আমরা নির্বাচনের পর তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে রংপুরাঞ্চলের মানুষকে নিয়ে জোড়ালো আন্দোলন করবো। এমন অবস্থায় সোমবার কাউনিয়া উপজেলায় তিস্তা নদীর ভাঙণ প্রবণ এলাকা পরিদর্শণে আসছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্ঠা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান।
আর আশ্বাস নয়, ১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করবে এমনটা দাবী তিস্তা অববাহিকার মানুষের।