১৮ ফাল্গুন, ১৪৩২ - ০২ মার্চ, ২০২৬ - 02 March, 2026

বালুতে আটকে আছে ফে‌রি: আড়াই বছরেও নাব্যতা সংকট কাটাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ

3 hours ago
10


রৌমারী-চিলমারী রু‌টে ফেরি চলাচল বন্ধ সাড়ে তিন মাস

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী - চিলমারী রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ টানা সাড়ে তিন মাস থেকে। ব্রাহ্মপুত্র নদের নাব্যতা সংকট দেখা দেয় প্রায় আড়াই বছর আগে। এই সংকট উত্তরণের কর্তৃপক্ষের নেয়া উদ্যোগ দীর্ঘদিনেও আলোর মুখ দেখেনি। এতে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলার যানবাহন ও সাধারণ মানুষের ঢাকা যাতায়াতে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বারবার চিঠি চালাচালি করলও মিলছে না সমাধান। বিআইডব্লিউটিএর মতে আগামী এপ্রিল-মে মাসের আগে নাব্যতা সমাধানের সম্ভাবনা নেই।

উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত জেলা কুড়িগ্রামে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চালু হয় ব্রহ্মপুত্র নদে রৌমারী-চিলমারী ফেরি সার্ভিস। কিন্তু চালুর পর প্রায় আড়াই বছরের মধ্যেই নাব্যতা সংকটের অজুহাতে অসংখ্যবার বন্ধ হয়েছে ফেরি চলাচল। সর্বশেষ গত (২০২৫) বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে নাব‌্যতা সংক‌টের কার‌ণে পুরোপুরি বন্ধ আছে ফে‌রি চলাচল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী রমনা ঘাট দিয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং রৌমারী প্রান্ত দিয়ে ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার যানবাহন এ রুট ব্যবহার করে আসছিল। ফেরি সচল থাকলে এ অঞ্চল থেকে ঢাকার দূরত্ব ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে যায়। ফলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় কম হ‌তো।

ফেরি বন্ধ থাকায় পরিবহনগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে বাড়‌তি সময়, জ্বালানি ও ভাড়া বে‌শি হ‌চ্ছে হ‌চ্ছে ব‌লে জানাযায়।

ভূরুঙ্গামারীর আন্তঃ‌জেলা ট্রাকচালক ফ‌রিদ মিয়া ব‌লেন,   প্রতি‌নিয়ত সোনাহাট স্থল বন্দর দি‌য়ে পাথর নি‌য়ে দে‌শের বি‌ভিন্ন স্থা‌নে যে‌তে হয়। ‌চিলমারী‌তে ফেরি চালু হওয়ার পর থে‌কে অ‌নেক সুবিধা হ‌তো এবং জ্বালানি খরচের পাশাপা‌শি সময়ও কম লাগ‌তো।

ট্রাকচালক হা‌মিদুল ইসলাম ও আব্দুর রশীদ  ব‌লেন, চিলমারী-‌রৌমারী রু‌টে যখন ফে‌রি চলাচল করতো তখন দুই প্রান্তে পণ‌্যবাহী ট্রা‌কের দীর্ঘ সা‌রি থাক‌তো। আমরাও অ‌নেক সাশ্রয়ে পারাপার হতাম। কিন্তু বারবার নাব‌্যতা সংক‌টের কার‌ণে ফে‌রি বন্ধ থাকায় বিড়ম্বনায় পড়‌তে হ‌চ্ছে। ড্রেজিং‌য়ের মাধ‌্যমে ফে‌রি চালু রাখ‌লে অর্থ‌নৈতকভা‌বে এই এলাকা অ‌নেক উন্নত হ‌তো।

এই রুটে গাড়ি চালক বাদশা ও এরশাদ হোসেন বলেন,প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা কমে যাওয়ায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়। তবে চলতি মৌসুমে আগাম প‌লি ভরাটের কার‌ণে চ্যানেল সংকুচিত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তণ, বালুচর জেগে ওঠা এবং বেসিন এলাকায় পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এ রুটে নিয়োজিত দুটি ফেরি ‘কদম’ ও ‘কুঞ্জলতা’ রৌমারী প্রান্তে পন্টুনের সঙ্গে চরাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। বেসিন এলাকায় কার্যকর ড্রেজিং না হওয়ায় ফেরি দুটি বালুচরে আটকে রয়েছে। এতে ফেরিগুলোর যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকলে সরকারের কয়েক কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর ড্রেজিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১ ও ১৭ ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি, ৮ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখেও একাধিকবার পত্র পাঠানো হয়েছে। তবুও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ফেরি চালু হওয়ার পর ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১০৪ দিনে ফেরি চলেছে ৯৭ দিন। এই সময়ে গাড়ি পারাপার হয়েছে ২ হাজার ৮৮৫টি। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ফেরি চলেছে ২৪১ দিন। এই সময়ে গাড়ি পারাপার হয়েছে ৬ হাজার ৫৬২টি। এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২১৮ দিনের মধ্যে ফেরি চলেছে মাত্র ৬৮ দিন। এই সময়ে গাড়ি পারাপার হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৫০টি।

২০২৪ সাল থেকে শুরু হয়েছে বিড়ম্বনা। ওই বছরে ফেরি চলেছে ২৪১ দিন, বন্ধ ছিল ১২৫ দিন। তবে এ বিড়ম্বনা আরও বেড়েছে ২০২৫ সালে। এ বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ফেরি চলেছে ২১৮ দিনের মধ্যে মাত্র ৬৮ দিন।

এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিসির চিলমারী-রৌমারী অঞ্চলের সহকারী ব্যবস্থাপক (হিসাব) নুরন্নবী সরকার বলেন, এই অঞ্চলে পরিবহনের চাপ ও ফেরির চাহিদা বিবেচনা ক‌রে শুকনো মৌসুমে ড্রেজিং জোরদার করলে কমপক্ষে চারটি ফেরি প্রয়োজন হবে। সারা বছর সার্ভিস সচল রাখা সম্ভব। জ্বালানি খরচ বিবেচনায় এ রুট নিয়মিত লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফে‌রি চালু থাক‌লে কম ড্রাফটের ফেরি নিয়োগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে ব‌লেও জানান তি‌নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নাব্যতা রক্ষায় পরিকল্পিত ও টেকসই উদ্যোগের অভাব রয়েছে। প্রয়োজনীয় গভীরতায় খনন না করা, চ্যানেল নির্ধারণে দুর্বলতা এবং সময়মতো ড্রেজিং না হওয়ায় প্রতিবছর একই সংকট তৈরি হচ্ছে। কাগজে-কলমে কাজ দেখালেও বাস্তবে নদী খন‌নে কোনো কাজ ক‌রে না।

চিলমারী রমনা ঘা‌টের হো‌টেল মা‌লিক রমজান আলী ব‌লেন, ফে‌রি চলাচল কর‌লে বি‌ভিন্ন এলাকার যানবাহন ও মানুষজন আস‌তো। সে সময় বেঁচা‌বি‌ক্রিও বেশ ভা‌লো হ‌তো।

এদি‌কে, ফেরি বন্ধ থাকায় যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের নৌকায় পারাপার করতে হচ্ছে। বেশি ভাড়া গুণতে হচ্ছে যাত্রীদের। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই নৌকায় পারাপারে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বাড়‌তি ভাড়া নিয়ে প্রায়ই যাত্রীদের সঙ্গে নৌকা মালিকদের বাকবিতণ্ডা দেখা দিচ্ছে।

ত‌বে নাব্যতা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও চর সৃষ্টির কারণে নাব্যতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ বিষ‌য়ে বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী স‌মির পাল ব‌লেন, প্রতি‌দিন সাত থে‌কে আট ঘণ্টা ড্রেজিং করে প্রায় ৪০ মি‌টার খনন করা হচ্ছে। আগামী এপ্রিল অথবা মে মা‌সের আগে ফে‌রি চালু করা সম্ভব না ব‌লে জানা এ কর্মকর্তা

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

// Set maxWidth