ইতিহাস ঐতিহ্য: রাজারহাটে রাজা ঘাটিয়াল শিলার পুনরাবির্ভাব নিয়ে কৌতুহল ও বুড়ার পাঠের নামকরণ
প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, রাজারহাট(কুড়িগ্রাম):
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নে ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়ার পাঠ’ নামটি শুধু একটি স্থানের পরিচয় নয়, এটি বহু প্রজন্মের বিশ্বাস, স্মৃতি এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক গভীর প্রতিচ্ছবি। এই স্থানের মূল আকর্ষণ ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি প্রাচীন শিলা। যাকে স্থানীয় মানুষ ভালোবেসে “রাজা ঘাটিয়াল”বা “বুড়া ঠাকুর”নামে অভিহিত করেন।
প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই শিলাটি কেবল একটি পাথর নয়, এটি ওই এলাকার সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের ভক্তি, প্রার্থনা ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অমূল্য প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে এখানে অসংখ্য মানুষ এসে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের মনের আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখ-কষ্ট এবং স্বপ্নের কথা প্রকাশ করেছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ‘বুড়া পূজা’ এই শিলাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এই পূজায় মানুষ শুকর, ছাগল পাঠা ও কবুতর উৎসর্গ করে তাদের মানত পূরণ করে থাকেন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বিশ্বাস, ভরসা এবং জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।
এই শিলাকে ঘিরেই ‘বুড়ার পাঠ’নামের উৎপত্তি। যা আজ পুরো এলাকাকে বুড়ারপাঠ নামে একটি আলাদা পরিচয় দিয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরাও এখানে আসে। কেউ মানত নিয়ে, কেউ বা কৃতজ্ঞতা জানাতে। এই স্থানটি যেন এক মিলনমেলা, যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ এক সুতোয় গাঁথা।
তবে এই ঐতিহ্যের পথে একসময় নেমে এসেছিল অন্ধকার। ১৯৯৭ সালের দিকে রহস্যজনকভাবে এই শিলাটি হারিয়ে যায়। ধারণা করা হয়, এটি চুরি হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, চোরেরা এটি দূরে নিয়ে যেতে পারেনি। প্রায় ৩ কিলোমিটারের মধ্যেই কোথাও এটি রেখে চলে যায়। বহু খোঁজাখুঁজির পরও তখন শিলাটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে মানুষের মনে হতাশা নেমে এলেও বিশ্বাসের আলো কখনো নিভে যায়নি।
অবশেষে ২৯বছর পর গত মঙ্গলবার(৩১ মার্চ) রাজা ঘাটিয়াল শিলা(বুড়া ঠাকুর) টিকে উদ্ধার করে বুড়ারপাঠে ফিরিয়ে নিয়ে আনা হয়েছে। এই দিনটি বুড়ার পাঠের ইতিহাসে এক আনন্দঘন মুহূর্ত হয়ে আসে। জানা গেছে, হারিয়ে যাওয়া সেই শিলাটি প্রায় ৩কিলোমিটার দুরে এতদিন এক হিন্দু দোকানে ছিল, যেখানে শিলাটিকে সাধারণ কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।বেশ কিছুদিন ধরে ওই হিন্দু ব্যবসায়ী শিলাটি তাঁর নিজ স্থানে ফিরে যাওয়ার জন্য স্বপ্ন (খোয়াগ) দেখাচ্ছিল। তাই তিনি শিলাটিকে ফিরিয়ে দিতে বুড়ারপাঠ এলাকার এক হিন্দু পুজারিকে খবর দেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর এলাকাবাসীরা তাঁর দোকান থেকে বুড়া ঠাকুরের শিলাটিকে উদ্ধার করেন। শিলাটি ফিরিয়ে আনার খবরে এলাকায় নেমে এসেছে হাজার হাজার মানুষের ঢল। হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষজন ভিড় জমাচ্ছে তাদের প্রিয় ঐতিহ্য শিলাটিকে এক নজর দেখার জন্য।
এ বিষয়ে বুড়ার পাঠ মন্দিরের পুরোহিত পরিমল পাঠক ওরফে কমল পাঠক বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বহু বছর আগে বুড়া ঠাকুরের শিলাটি হারিয়ে যায়। মঙ্গলবার(৩১মার্চ) দুপুরে শিলাটিকে একটু ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে এলাকাবাসীরা।