রাজারহাটে অভাবের সংসারে স্বপ্নের জয়, যমজ দুই বোন পেল জিপিএ-৫
প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম):
একই সঙ্গে পৃথিবীতে এসেছিল দুই বোন। বেড়ে ওঠাও একসঙ্গে, স্বপ্নও ছিল অভিন্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। সংসারে অভাব-অনটন, বাবার বেকারত্ব, পড়াশোনার খরচ জোগাতে পরিবারের সীমাহীন সংগ্রাম-সবকিছুকে পেছনে ফেলে অবশেষে সাফল্যের মুখ দেখেছে তারা। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় দুজনই এক সঙ্গে অর্জন করেছে জিপিএ-৫। তারা হলেন-কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার। যমজ এই দুই বোন রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে একই ফল অর্জন করে পরিবার ও এলাকাবাসীর মুখ উজ্জ্বল করেছে। এবারে এই জমজ দুই বোনই রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেনকেলেজ থেকে জিপিএ -৫ পেয়েছে।
তবে এই সাফল্যের গল্প শুধু দু'টি জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়। এটি দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই, মায়ের ত্যাগ, শিক্ষকদের মানবিক সহযোগিতা আর দুই বোনের অদম্য অধ্যবসায়ের গল্প।
রহিমা ও রাবেয়ার বাবা মনির হোসেন সরদার রিজু এবং মা নাসিমা বেগম। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। পরিবারের ছোট দুই মেয়ে যমজ রহিমা ও রাবেয়া। সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা বেকার থাকায় সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যে দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো ছিল পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবু মেয়েদের শিক্ষার পথ বন্ধ হতে দেননি মা-বাবা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে দুই বোন।
তাদের এই পথচলায় পাশে দাঁড়িয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল। কলেজ কর্তৃপক্ষও ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি উপবৃত্তির অর্থও তাদের পড়াশোনায় সহায়ক হয়েছে।
দুই মেয়ের সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী বেকার। অনেক কষ্ট করে মেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছি। প্রাইভেট শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল স্যার দুই বোনের মধ্যে একজনকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন। কলেজের অধ্যক্ষ স্যার ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে নামমাত্র টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া তারা উপবৃত্তিও পেয়েছে। এসব সহযোগিতা না পেলে হয়তো মেয়েদের পক্ষে এত ভালো ফল করা সম্ভব হতো না।’
সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে রহিমা ও রাবেয়া বলে, ‘বাবার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে ভালো ফল করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি। কলেজে যাতায়াত ও খাওয়া-দাওয়ার সময়টুকু বাদে প্রায় সব সময়ই পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকতাম। ঘুমও হতো খুব সীমিত। আমাদের স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আইন বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করে বিচারক হওয়া।’
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজারহাট উপজেলার ১৪টি কলেজের মধ্যে এই যমজ দুই বোনই মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তাদের এ অসাধারণ সাফল্যে আমরা আনন্দিত। কলেজের পক্ষ থেকে দুজনকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই।’
অভাবের সংসারে থেকেও স্বপ্নকে ছোট হতে দেয়নি রহিমা ও রাবেয়া। তাদের ফলাফল প্রমাণ করেছে, আর্থিক সীমাবদ্ধতা মেধা ও অধ্যবসায়ের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না। পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষকদের সহযোগিতা আর নিজেদের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে চায় যমজ এই দুই বোন। তাদের সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, গর্বিত কলেজ এবং অনুপ্রাণিত এলাকার শিক্ষার্থীরা।#