২১ কার্তিক, ১৪৩৩ - ০৫ নভেম্বর, ২০২৬ - 05 November, 2026

গঙ্গাচড়ায় অগ্নিকাণ্ডে দুই ভাইয়ের ৮ লাখ টাকার ক্ষতি, পুড়ে মরল গরু ও ২ ছাগল

77
2026-11-05 18:16:50

news-picture

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই ভাইয়ের তিনটি বসতঘর, একটি রান্নাঘর, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে একটি গরু ও দুটি ছাগলও পুড়ে মারা গেছে। এতে দুই পরিবারের প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। বসতঘর ও সহায়-সম্বল হারিয়ে পরিবার দুটি এখন চরম বিপাকে পড়েছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যায় উপজেলার গঙ্গাচড়া ইউনিয়নের পশ্চিম নবনীদাস (মাঠের পাড়) গ্রামে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্তরা হলেন ওই গ্রামের মৃত সতীশ চন্দ্র রায়ের ছেলে অশোক চন্দ্র রায় (৫০) ও তাঁর ছোট ভাই নরেশ চন্দ্র রায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যায় বাড়িতে পূজা-অর্চনা ও সন্ধ্যাবাতি দেওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বাড়ির বাইরে ছিলেন। এ সময় হঠাৎ তাঁদের বসতঘরে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রতিবেশী গোলাপী রানী আগুন দেখতে পেয়ে আশপাশের লোকজনকে খবর দেন। স্থানীয়রা ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ায় তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। খবর পেয়ে গঙ্গাচড়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই ঘরবাড়ি ও মালামালের অধিকাংশ পুড়ে যায়।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরের স্থানে পড়ে আছে পোড়া টিন, বাঁশ ও কাঠের টুকরো। চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে আগুনে পুড়ে যাওয়া আসবাবপত্র ও সংসারের ব্যবহার্য জিনিসপত্র। বাড়ির পাশে পোড়া টিন দিয়ে তৈরি অস্থায়ী একটি চালাঘরে রাত কাটিয়েছেন অশোক চন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রী চানু বালা। আগুনে গবাদিপশু হারানোর পাশাপাশি তাঁদের দীর্ঘদিনের জমানো অর্থ ও মূল্যবান স্বর্ণালংকারও নষ্ট হয়েছে।

অশোক চন্দ্র রায় পেশায় শ্রমজীবী। এলাকায় ঘুরে ঘুরে নারকেল ও খেজুরগাছের ডাল কাটেন। পাশাপাশি বিভিন্ন বাগানে কীটনাশক প্রয়োগের কাজ করেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে তিন-চার বছর আগে। ছেলে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকেন। ছেলের বিয়ের জন্য অল্প কিছু জমি কিনে নতুন বাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। বাবার কাছ থেকে পাওয়া মাত্র দুই শতক জমির ওপরই ছিল তাঁদের বসতবাড়ি।

অশোক চন্দ্র রায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিশ্রম করে ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। মেয়ের বিয়ের পর কয়েক বছর ধরে কিস্তিতে টাকা তুলে এবং বিভিন্ন কাজ করে সঞ্চয় গড়েছিলেন। ঘরে নগদ প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিল। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা আংশিক পোড়া অবস্থায় উদ্ধার করা গেলেও বাকি টাকা পুড়ে গেছে। সম্প্রতি কিস্তিতে আরও ৫০ হাজার টাকা তুলেছিলেন, যার মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার টাকা এখনো পরিশোধ করা বাকি। তিনি বলেন, ছেলের বিয়ের আগে কিছু জমি কিনে বাড়ি করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আগুনে তাঁর সব সঞ্চয় ও স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।

তিনি আরও জানান, মেয়ের বিয়ের সময় ধারদেনা করে প্রায় দুই লাখ টাকার স্বর্ণালংকার দিয়েছিলেন। মেয়ের সন্তান হওয়ার সময় সেই স্বর্ণালংকার তাঁর স্ত্রীর কাছে রাখা হয়েছিল। আগুনে সেগুলোও পুড়ে গেছে।

প্রতিবেশী গোলাপী রানী জানান, সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ বাড়িটির দিক থেকে আগুনের শিখা দেখতে পান তিনি। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছাদের ওপর ছড়িয়ে পড়তে থাকলে আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। স্থানীয়রা পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে ঘরের ভেতরে থাকা গবাদিপশুগুলোকে বের করে আনার সুযোগ হয়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ততক্ষণে পরিবার দুটির ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় সবকিছু পুড়ে যায়।

গঙ্গাচড়া ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার আরিফুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।

পরিবারের ধারণা, বাড়ির পূজার ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি পরিদর্শন করেন রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রায়হান সিরাজী। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নগদ অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী সহায়তা দেন এবং ভবিষ্যতে আরও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সংসদ সদস্য মো. রায়হান সিরাজী বলেন, অগ্নিকাণ্ডে পরিবার দুটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এমন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সবার মানবিক দায়িত্ব। তাঁদের তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের অসহায় পরিবার দুটির সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গঙ্গাচড়া উপজেলা আমির মাওলানা মো. নায়েবুজ্জামান, গঙ্গাচড়া ইউনিয়ন আমির মনিছুর রহমান, বড়বিল ইউনিয়ন আমির সোহাগ মিয়াসহ স্থানীয় জামায়াতের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

আগুনে সর্বস্ব হারানো পরিবার দুটির আর্থিক অবস্থা আগে থেকেই ভালো ছিল না। নতুন করে ঘর নির্মাণ ও সংসার গোছানোর সামর্থ্য না থাকায় তাঁরা এখন স্থানীয়দের সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়