৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ - ১৪ জুন, ২০২৬ - 14 June, 2026

লাখ কোটি টাকার শিক্ষা বাজেট: উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নাকি পুরোনো গল্পের পুনরাবৃত্তি?

13
2026-06-14 20:39:09

news-picture

মোঃ মাহিম মুনতাসির:

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দের ঘোষণা এসেছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। সংখ্যার দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে প্রশ্ন জাগে—এই বিশাল বরাদ্দ কি সত্যিই শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনবে, নাকি এটি অতীতের মতো আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির খবর স্বাভাবিকভাবেই আশাব্যঞ্জক। সরকারের পক্ষ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সহজ শর্তে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত শিক্ষা ঋণ চালুর প্রস্তাব অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরি করবে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে যারা এতদিন আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি আশার বার্তা।

এছাড়া ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই এবং বিদেশি ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ বর্তমান সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে আশার পাশাপাশি কিছু বাস্তবতাও রয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অতীতে বরাদ্দকৃত অর্থের কতটুকু কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে? এখনও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, গবেষণার সুযোগ সীমিত, আধুনিক ল্যাবের সংকট রয়েছে এবং দক্ষ শিক্ষক তৈরির চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। শুধু বাজেটের অঙ্ক বাড়লেই এসব সমস্যার সমাধান হবে না।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দকে আদর্শ ধরা হয়। সেই তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান বরাদ্দ এখনও অনেক কম। ফলে শিক্ষা খাতকে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে হলে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নেরও প্রয়োজন।

একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের অভাব নয়, বরং সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাব। বরাদ্দকৃত অর্থ যদি যথাযথভাবে ব্যয় না হয়, তাহলে লাখ কোটি টাকার বাজেটও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। অন্যদিকে, সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বরাদ্দ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।

তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেটকে আমি একদিকে সম্ভাবনার নতুন দ্বার হিসেবে দেখি, অন্যদিকে এটিকে একটি বড় পরীক্ষাও মনে করি। এই বাজেট উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বহন করছে, কিন্তু তার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বড় অঙ্কের বাজেট দেখতে চায় না; তারা চায় উন্নত শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, দক্ষ শিক্ষক এবং একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা।

এখন দেখার বিষয়, এই রেকর্ড বাজেট সত্যিই শিক্ষার নতুন ইতিহাস রচনা করে, নাকি এটি আবারও পুরোনো গল্পের পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়