১৩ শিক্ষার্থী নিয়ে তিন শ্রেণির পাঠদান একজন শিক্ষকের; প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ
নির্মল রায়:
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পূর্ব ইচলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংকট, পাঠদানের দুর্বলতা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগে সংবাদ প্রকাশের পরদিনও পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক মাহমুদা বেগম ময়না ও তার সহকারী শিক্ষক বোন মকসুদা বেগম পাখির দায়িত্বে অবহেলা এবং অনিয়মের কারণেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।
সোমবার (২২ জুন) দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণিতে উপস্থিত রয়েছে মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী, চতুর্থ শ্রেণিতে ৪ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৬ জন শিক্ষার্থী। মোট ১৩ জন শিক্ষার্থীকে একই শ্রেণিকক্ষে একসঙ্গে পাঠদান করাচ্ছিলেন সহকারী শিক্ষক মোশাররফ হোসেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক মাহমুদা বেগম ময়না সকালে বিদ্যালয়ে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে রংপুরে চলে যান। অপরদিকে তার বোন সহকারী শিক্ষক মকসুদা বেগম পাখি দুপুর ২টার দিকে ব্যাংকের কাজের কথা বলে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। অন্য দুই শিক্ষক আরাফাত রহমান ও গোলাম মোর্শেদ জামিল ছুটিতে থাকায় পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম একজন শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এর আগে আমাদের প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংকট, পাঠদানের দুর্বলতা, অনেক শিক্ষার্থীর বাংলা ও ইংরেজি রিডিং করতে না পারা এবং দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশ (WASH) রুম অচল থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একাধিকবার উপজেলা শিক্ষা অফিসে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এরপরও একই ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে।
স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য, “বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমছে, শিক্ষার মানও দিন দিন নিম্নমুখী হচ্ছে। বারবার অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশ এবং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের পরও যদি কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ। দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
তারা আরও বলেন, “একজন শিক্ষক দিয়ে তিনটি শ্রেণির পাঠদান চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও কার্যকর তদারকি না থাকায় সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।”
এ বিষয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শায়লা জেসমিন সাঈদ বলেন, “প্রকাশিত অভিযোগ ও নতুন তথ্যগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বেতন বন্ধের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি দ্রুত তদন্ত করে দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হোক। তাদের মতে, সংবাদ প্রকাশের পরও যদি একই চিত্র অব্যাহত থাকে, তাহলে তা শুধু একটি বিদ্যালয়ের সংকট নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।