১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ - ০২ জুন, ২০২৬ - 02 June, 2026

বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপে, অদৃশ্য সিন্ডিকেটের ছায়ায় যুবসমাজ ধ্বংসের পথে

37
2026-06-02 17:19:05

news-picture
সীমান্তবর্তী রুট দিয়ে প্রতিদিন প্রবেশ করছে মাদক;বাড়ছে চুরি-ছিনতাই, উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও সচেতন মহল

বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:

রংপুরের বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলায় দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে মাদকের বিস্তার। সীমান্তবর্তী জেলা ও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করছে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযানে খুচরা বিক্রেতা ও পরিবহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও মূল ডিলার ও সিন্ডিকেট সদস্যরা রয়ে যাচ্ছে অধরাই। ফলে মাদক ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে এর নেটওয়ার্ক।

স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সমাজসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক দুর্বলতার সুযোগে দুই উপজেলায় মাদক ব্যবসা নতুন করে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই সময় গড়ে ওঠা অনেক নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ, হাট-বাজার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা কাজে লাগিয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশের মাদক নেটওয়ার্ক সাধারণত চার ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথম ধাপে সীমান্ত এলাকা থেকে সংগ্রাহকরা মাদক দেশে নিয়ে আসে। দ্বিতীয় ধাপে ডিলারদের মাধ্যমে তা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় ধাপে মধ্যবর্তী সরবরাহকারীরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। সবশেষে স্থানীয় খুচরা বিক্রেতারা পাড়া-মহল্লায় মাদক সরবরাহ করে থাকে। এভাবে একাধিক স্তরে পরিচালিত হওয়ায় মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

## বদরগঞ্জে একাধিক রুটে মাদক প্রবেশ

স্থানীয়দের অভিযোগ, বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর, গোপীনাথপুর, বিষ্ণুপুর ও লোহানীপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ রুট বর্তমানে মাদক প্রবেশের অন্যতম করিডোরে পরিণত হয়েছে। এসব পথ ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দিনাজপুরের পার্বতীপুর এলাকা থেকে গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য সহজেই প্রবেশ করছে। এছাড়া কুতুবপুর, গোপালপুর, কালুপাড়া, দামোদরপুর, মধুপুর ও রাধানগর ইউনিয়নের বিভিন্ন সংযোগ সড়ক ব্যবহার করেও প্রতিনিয়ত মাদক পরিবহন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাতের অন্ধকারে এবং কখনো দিনের বেলাতেও এসব মাদক চালান বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

## তারাগঞ্জেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের সঙ্গে নীলফামারী জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার সংযোগ রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও বিস্তৃত গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা সহজেই এলাকা পরিবর্তন করতে পারে। ফলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে অনেক রুট। স্থানীয়দের মতে, মাদক ব্যবসায়ীরা প্রায়ই ইউনিয়ন ও উপজেলা সীমানাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে। এক এলাকায় অভিযান চালানো হলে দ্রুত অন্য এলাকায় সরে যায় তারা।

## বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও সামাজিক অবক্ষয়

মাদক বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দুই উপজেলায় চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক কলহ এবং কিশোর অপরাধের ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নেশার টাকা জোগাড় করতে অনেক তরুণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লালদিঘি পীরপাল কলেজের এক শিক্ষক বলেন, “মাদক এখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণদের একটি অংশ ধীরে ধীরে এই ভয়ঙ্কর নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।” লোহানীপাড়া ইউনিয়নের মাঠেরহাট এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগের তুলনায় এখন মাদকের বিস্তার অনেক বেশি। গ্রামের সাধারণ মানুষও এর প্রভাব অনুভব করছে। চুরি-ছিনতাই বেড়েছে, পরিবারে অশান্তি বাড়ছে।”

## উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা

বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রুকাইয়া জান্নাত বলেন, “মাদক থেকে তরুণদের দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সচেতনতা না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।” বদরগঞ্জ মডেল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, “প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। শুধুমাত্র পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সমস্যা সমাধান হবে না।”

## প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

গোপীনাথপুর ইউনিয়নের সমাজ সেবক লাবলু চৌধুরী বলেন, “আমার এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হয়। বিষয়টি একাধিকবার পুলিশকে জানিয়েছি। কিন্তু এখনো কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। মাদকের কারণে সমাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।” তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অত্যন্ত কৌশলী হওয়ায় মূল সিন্ডিকেট ভাঙতে সময় লাগছে।

## যা বললেন ওসিরা

বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার জানান, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং মাদকের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রুহুল আমিন বলেন, মাদক নির্মূলে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

## মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি

সচেতন মহলের মতে, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা অর্থদাতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব হবে। বর্তমানে বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জের সাধারণ মানুষের একটাই দাবি— মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়