১৬ আষাঢ়, ১৪৩৩ - ৩০ জুন, ২০২৬ - 30 June, 2026

জুলাই-পরবর্তী ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা: ছাত্ররাজনীতির পরিবর্তনে নতুন সমীকরণ

8
2026-06-30 19:20:56

news-picture

ইবতেশাম রহমান সায়নাভ : বেরোবি:

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। এখানে যেমন জ্ঞানচর্চা হয়, তেমনি মতের বিনিময়, নেতৃত্বের বিকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং রাজনৈতিক সচেতনতারও বিকাশ ঘটে। এই বহুমাত্রিক পরিবেশে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। এটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসন এবং বৃহত্তর সমাজের মধ্যে তথ্যের সেতুবন্ধন তৈরি করে, অনিয়ম-অসঙ্গতি তুলে ধরে এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা কখনোই পুরোপুরি রাজনীতির প্রভাবমুক্ত ছিল না। বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতির প্রভাব বহু ক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহ, প্রকাশ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রতিফলন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির শক্তির ভারসাম্য বদলেছে, নতুন নেতৃত্বের উত্থান হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া ও আন্দোলনের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতাও প্রবেশ করেছে এক নতুন বাস্তবতায়। প্রশ্ন হলো, এই নতুন বাস্তবতা কি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে, নাকি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে?

দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়েছে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে। কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে অনেককে ভাবতে হয়েছে, এতে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ক্ষুব্ধ হবে কি না, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে কি না, কিংবা সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংগঠনিক বা প্রশাসনিক চাপ আসবে কি না। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই সংবাদমাধ্যমে যথাযথভাবে উঠে আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ সাংবাদিকদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে এই চিত্র কিছুটা বদলেছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকরা প্রশাসনিক অনিয়ম, আবাসিক হলের সমস্যা, টেন্ডার বা নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ, যৌন হয়রানি, শিক্ষার মান, গবেষণার সংকট এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আগের তুলনায় বেশি কাজ করছেন। আগে যেসব বিষয় প্রকাশ করতে দ্বিধা ছিল, সেগুলো নিয়েও এখন অনেক জায়গায় আলোচনা হচ্ছে। এটি ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি লক্ষণ।

তবে এই পরিবর্তনকে অতিরঞ্জিত করারও সুযোগ নেই। কারণ ক্ষমতার শূন্যতা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যেখানে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব কমে, সেখানে অন্য কোনো গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। ফলে সাংবাদিকদের জন্য চ্যালেঞ্জের ধরন বদলালেও চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অনলাইন হয়রানি কিংবা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমন্বিত চাপ এখন নতুন বাস্তবতা। ফলে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের শুধু মাঠেই নয়, ডিজিটাল পরিসরেও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

বর্তমান সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য যাচাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই নানা ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এর অনেকগুলোই অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এমন পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের দায়িত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। দ্রুত হওয়ার প্রতিযোগিতায় নয়, বরং নির্ভুল তথ্য প্রকাশের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হবে। একটি ভুল সংবাদ শুধু একজন ব্যক্তি নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবেগে ভেসে গিয়ে কোনো সাংবাদিক যদি নিজেই কোনো পক্ষের ভাষ্যকার হয়ে ওঠেন, তাহলে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সংবাদকর্মীর দায়িত্ব কোনো গোষ্ঠীকে সমর্থন বা বিরোধিতা করা নয়; বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য তুলে ধরা। গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতার শক্তি এখানেই।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা, সংবাদ সংগ্রহে অযথা বাধা না দেওয়া, সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও দায়িত্ব তথ্য সংগ্রহে নৈতিকতা, ভারসাম্য এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখা। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং দায়িত্বশীল প্রশাসন দুটিই একে অপরের পরিপূরক।

এখানে শিক্ষার্থীদের ভূমিকাও কম নয়। অনেক সময় ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। এটি সাংবাদিকতার জন্য ক্ষতিকর। একজন ক্যাম্পাস সাংবাদিকের পরিচয় প্রথমত একজন সাংবাদিক, কোনো রাজনৈতিক কর্মী নয়। তাঁকে তাঁর কাজের মান, তথ্যের নির্ভুলতা এবং পেশাগত নৈতিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিও ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার চরিত্র বদলে দিয়েছে। একটি সংবাদ শুধু পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না; মুহূর্তেই ফেসবুক, ইউটিউব, ওয়েব পোর্টাল এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সাংবাদিকদের মাল্টিমিডিয়া দক্ষতা, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে সাংবাদিকদের শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তথ্যের উৎস সুরক্ষিত রাখা, ব্যক্তিগত ডিভাইস ও অনলাইন

অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সাংবাদিকতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তথ্য বিশ্লেষণ, ডেটা সাজানো কিংবা প্রাথমিক খসড়া তৈরিতে এআই সহায়ক হতে পারে। তবে প্রযুক্তি কখনো সাংবাদিকের বিচারবোধ, নৈতিকতা এবং মানবিক সংবেদনশীলতার বিকল্প হতে পারে না। তাই প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও দায়বদ্ধতা সাংবাদিকেরই।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো নতুন করে আস্থা অর্জন করা। দীর্ঘদিনের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর মনে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এখন যদি ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করেন এবং সমালোচনার মুখেও পেশাগত নীতি অনুসরণ করেন, তাহলে সেই আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনই হবে এই সময়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

একই সঙ্গে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের নিজেদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, মোবাইল জার্নালিজম, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং মাল্টিমিডিয়া স্টোরিটেলিং—এসব দক্ষতা এখন আর বাড়তি যোগ্যতা নয়; বরং সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও উচিত নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও নৈতিক সাংবাদিকতা বিষয়ক আলোচনা আয়োজন করা।

তবে মনে রাখতে হবে, স্বাধীন সাংবাদিকতা কেবল সাংবাদিকদের একার দায়িত্ব নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সমাজসহ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে একজন সাংবাদিক ভয়, হুমকি বা চাপ ছাড়াই সত্য প্রকাশ করতে পারেন। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হতে পারে না।

জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতা বাংলাদেশের ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে যদি সাংবাদিকতা আরও পেশাদার, বস্তুনিষ্ঠ এবং জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠতে পারে, তাহলে এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যতের জন্যও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কিন্তু যদি রাজনৈতিক আনুগত্য, গোষ্ঠীগত স্বার্থ কিংবা ব্যক্তিগত অবস্থান সাংবাদিকতার ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে পরিবর্তনের এই সুযোগও হারিয়ে যাবে।

সবশেষে বলা যায়, জুলাই-পরবর্তী ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং সাংবাদিকতার চরিত্র কতটা পরিবর্তিত হবে। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, তথ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা তার প্রকৃত শক্তি অর্জন করতে পারে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই মুহূর্তকে যদি সাংবাদিকরা আত্মসমালোচনা, পেশাগত উন্নয়ন এবং নৈতিকতার পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন, তবে ভবিষ্যতের ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা হবে আরও স্বাধীন, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও জনমুখী। সেই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড়।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়